বরিশালে মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের তৎপরতার হিসাব কাগজে-কলমে কম নয়। শুধু গত ডিসেম্বরেই ৩৭টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। তাতে ৪৬টি মামলায় ৪৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ১৪৬টি অভিযানে ২৩০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।
উদ্ধারের তালিকায় আরো রয়েছে ৩৬ অ্যাম্পুল নেশা জাতীয় ইনজেকশন আর এক কেজির বেশি গাঁজা।
জেলা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির সভায় তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী, মাদকের বিস্তার রোধে বরিশালজুড়ে অভিযান চলছে। তবে পরিসংখ্যানের বাইরে আরেকটি বাস্তবতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় মাদকের বাজার কার্যত উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
অভিযান চললেও মাদকের বিকিকিনি কমছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
শহর ছাড়িয়ে গ্রাম, সহজলভ্য নেশা
একসময় শহরকেন্দ্রিক থাকা মাদকের ভয়াবহতা এখন ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায়ও। ইয়াবা, গাঁজা কিংবা সহজাতীয় মাদকের কোনোটিই আর দুর্লভ নয়। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘হাত বাড়ালেই মিলছে নেশা’।
সহজলভ্যতার এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে কিশোর ও তরুণরা। বেকারত্বের সঙ্গে মাদকের হাতছানি যুক্ত হয়ে যুব সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।
সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত এক বৈঠকে উপজেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তার বক্তব্যেও উঠে এসেছে গৌরনদীর মাদক পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র। উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত মাদক কেনাবেচা চলছে। চিহ্নিত কিছু বিক্রেতা প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি করছে।
পাশাপাশি বড় ডিলাররা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকে খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বড় ডিলারদের অনেকেই গৌরনদীর বাইরে অবস্থান করলেও এখানকার বেকার তরুণদের ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। অল্প সময়ে ভাগ্য বদলের আশায় জড়িয়ে পড়ছে অনেক তরুণ।
তালিকা আছে, ধারাবাহিক অভিযান নেই
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, প্রশাসনের কাছে মাদক বিক্রেতাদের তালিকা থাকলেও সেই তালিকা ধরে নিয়মিত চিরুনি অভিযান দেখা যায় না। নামমাত্র দুই-একটি অভিযান হলেও পরিস্থিতি দ্রুত আগের জায়গায় ফিরে যায়। এর ফলে গৌরনদীতে দিন দিন মাদকসেবী ও বিক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে।
বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর সদস্য কবি হেনরী স্বপন বলেন, মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা পরিচিত মুখ। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে প্রশাসন সবারই জানা তারা কারা। এমনকি প্রশাসনের তালিকায়ও তাদের নাম রয়েছে। কিন্তু সেই তালিকা কখনও প্রকাশ্যে আসে না। তালিকা প্রকাশ পেলে সামাজিক চাপ সৃষ্টি হতো এবং অনেকেই মাদক থেকে সরে আসতে বাধ্য হতো।
গৌরনদীতে মাদক পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি স্বীকার করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. ইব্রাহীম। তিনি বলেন, প্রতিটি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় মাদকের বিরুদ্ধে সাড়াশি অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
গৌরনদী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু ছালেহ মো. আনছার উদ্দিন বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান একটি চলমান প্রক্রিয়া। খুব শিগগিরই অভিযান আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নগরীর বস্তিতে নীরব সন্ত্রাস
মাদক সমস্যার আরেকটি অন্ধকার দিক দেখা যাচ্ছে বরিশাল নগরীর বিভিন্ন সরকারি খাসজমির কলোনিতে। পলাশপুর, কেডিসি, স্টেডিয়াম, রসুলপুর, শিশুপার্ক, মোহাম্মপুর ও ভাটারখাল বরফকল কলোনিতে কয়েক লাখ নিম্নআয়ের মানুষ বসবাস করেন। ঘনবসতিপূর্ণ এসব এলাকায় অপরাধীরা নিরাপদ আশ্রয় নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাদক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে কিশোর গ্যাং গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের মাধ্যমেই মাদক পরিবহন ও খুচরা বিক্রি হয়। কলোনীবাসীরা ভয়ে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী বলেন, মারামারি প্রায় নিত্যদিনের ঘটনা। শিশুদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় লাগে। আড়ালে শিশুদের হাতে বিড়ি ও গাঁজা ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মাদক বহনে বাধ্য করা হয়। রাজি না হলে মারধর করা হয়।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অপরাধীরা বস্তি এলাকাগুলোতে আশ্রয় নেয়। এসব এলাকায় আমরা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নজর রাখছি, যাতে কেউ আশ্রয় নিয়ে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে। অভিযান চলছে, সামনে আরো অভিযান চালানো হবে।
